ভাষা আন্দোলন

ভাষা আন্দোলন এর ইতিবৃত্ত

ভাষা আন্দোলন হলো বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়ার জন্য তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। ভাষা আন্দোলন ছিলো বাঙালীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত পুর্ব বাংলার সব আন্দোলনের ভিত্তি ছিলো। বলা যায় বাংলা ভাষার এই আন্দোলনই ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের সূতিকাগার।

ভাষা আন্দোলন এর প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে সৃষ্ট পাকিস্তানের দুই অংশ পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব ছিলো প্রায় ২০০০ কিলোমিটার, ভাষা এবং সংস্কৃতিতে ছিলো বিস্তর তফাৎ। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিলো পাঞ্জাবী আর মাত্র ৩.২৭% মানুষের ভাষা ছিল উর্দু, অপরদিকে পূর্ব পাকিস্থানের সংখ্যাগরিষ্ঠ  (প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ) মানুষের ভাষা বাংলা, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪% ছিলো। পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ ঐ অঞ্চলের বুদ্ধিজীবীরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে পুর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। পাকিস্তান স্বাধীনের পর থেকেই এই আন্দোলন শুরু হয়।

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব দিলে সেখানে প্রতিবাদ করেছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।

এরপর ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে খালিকুজ্জামান এবং এরপরে জুলাই এ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব রাখেন। এতে বিরোধিতা করেন বাংলা ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হক। তৎকালীন সময়ের পত্রিকা গুলো বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধু ও নিবন্ধ প্রকাশ করতে থাকে। এর মধ্যে দৈনিক ইত্তিহাদে প্রকাশিত আবদুল হক ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর কলাম ছিলো উল্লেখযোগ্য। ’৪৭ এর জুলাই মাসে ‘গণ আজাদী লীগ’ নামের একটি সংগঠন বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা করার দাবি জানায়।

স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের কার্যকরি ভাষার ব্যাপারে ঢাকার শিক্ষিত সমাজ নিজেদের দাবি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন; পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ও সরকারি সকল কাজ পরিচালনার করা হবে বাংলা মাধ্যমে আর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা ও উর্দু উভয়ই।

ভাষা আন্দোলন এর সাংগঠনিক রূপ

পাকিস্তান স্বাধীনের পর ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত প্রথম সংগঠন তমুদ্দিন মজলিশ। ১৯৪৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম তমুদ্দিন মজলিশ গঠন করেন। এই সংগঠনের চেষ্টায় ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক প্রথম পুস্তিকা বের হয় ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। পুস্তিকাটির নাম ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’। বইটিতে লেখক ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ ও ড. কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। তমুদ্দিন মজলিশ সংগঠন বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের একটি সরকারি ভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ফজলুল হক মুসলিম হলে ১২ই নভেম্বর একটি আলোচনা সভা করে। কিন্তু ঐদিকে পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে বাদ দিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। একইসাথে পাকিস্তানের তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান মালিক উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কাজ শুরু করেন।  তমুদ্দিন মজলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে পূর্ব বঙ্গের গণ-পরিষদের মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার এবং নুরুল আমিনের সাথে বৈঠক করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথেও দেখা করেন।

১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজের ছাত্ররা মিলে বাংলা ভাষার দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ করে। এরপর তমুদ্দিন মজলিশের উদ্যোগে ১৯৪৭ এর ১লা অক্টোবর নুরুল হক ভুঁইয়া আহবায়ক করে গঠন করা হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় পরিষদ সদস্য তৎকালীন কুমিল্লার (বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া) পূর্ব বাংলা কংগ্রেস দলীয় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ভাষার পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন যা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বাঁধার মুখে বাতিল হয়ে যায়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তাই ভাষা আন্দোলনের পথপ্রদর্শক বলা হয়। এর প্রতিবাদে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হয়। ১৯৪৮ এর ২রা মার্চ  ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনরায় গঠিত হয় শামসুল আলমকে আহবায়ক করে।

১৯৪৮ এর ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের একটি বিশেষ দিন। এ দিন বাংলা ভাষার দাবিতে সাধারন ধর্মঘট পালিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর আহবানে। এখান থেকে ধর্মঘটের পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগান দেয়ার সময় পুলিশ কয়েক ধাপে কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, আবদুল ওয়াহেদ সহ মোট ৬৯ জনকে গ্রেফতার ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অনেককে আহত করে। এর প্রতিবাদে ১২ থেকে ১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়। আন্দোলন সামাল দিতে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ছাত্রনেতা কমরুদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চকে ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।  

২১ মার্চ, ১৯৪৮ এ পশ্চিম পাকিস্তানের স্থপতি, গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) এক জনসভায় উর্দুকে পাকিস্থানে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন এবং এর বিরোধিতাকারীদের পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan”। সাথে সাথে বাংলাভাষী জনগণ এর প্রতিবাদ করে। এরপর ২৪ শে মার্চ, ১৯৪৮ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কার্জন হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একই ঘোষণা দেন। এতে উপস্থিত ছাত্ররা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ছাত্রদের একটি দল মোহাম্মদ জিন্নাহ এর সাথে দেখা করেন, তখন জিন্নাহ খাজা নাজিমুদ্দীনের করা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। ২৮ শে মার্চ করাচিতে ফিরে তিনি রেডিওর বক্তব্যতে একই কথা বলেন। ১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় উর্দুর পক্ষে একই ঘোষনা দেন।

১৯৪৯ সালের ৯ মার্চ পাকিস্তান সরকার একবার আরবি হরফ দিয়ে বাংলা লেখানোর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বাংলা ভাষা সংস্কার করতে ‘পূর্ববাংলা ভাষা কমিটি’ গঠন করে, যার সভাপতি ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ আবদুল মতিনকে আহবায়ক করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।

ভাষা আন্দোলন এর মূল পর্ব

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমিন। এই বছরের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানের এক সভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে ২৯শে জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০শে জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালন করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সেখান থেকে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ৪০ সদস্যের ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই পরিষদের আহবায়ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র বরিশালের কাজী গোলাম মাহবুব।

৪ঠা ফেব্রুয়ারি পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাবেশ করেন। সমাবেশ শেষে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এদিকে ফরিদপুর কারাগারে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ভাষার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর পক্ষ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি (বাংলা ৮ ফাল্গুন, ১৩৪৯ সাল, বৃহস্পতিবার) সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। ধর্মঘট প্রতিহত করতে প্রশাসন ঢাবি ও এর আশেপাশের এলাকায় ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে ছাত্ররা বৈঠক করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পূর্বনির্ধারিত কর্মসুচী বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

২১ ও ২২ শে ফেব্রুয়ারি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়, বর্তমান মেডিকেল কলেজের সামনে, ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯ টায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে সমবেত হতে শুরু করে। তারা ১৪৪ ধারার বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তারা ভাষার ব্যাপারে জনগনের মতামত বিবেচনা করতে পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের আহবান জানান।   

ঢাবির উপাচার্য ড. এস এম হোসাইনসহ কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রদের ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার অনুরোধ করেন। বেলা সোয়া ১১ টার দিকে ছাত্ররা একত্র হয়ে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ছাত্রদের সতর্ক করে। ছাত্ররা ভাগ হয়ে একটি গ্রুপ ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে দৌড়ে যায়, অন্য গ্রুপ ঢাবি তেই মিছিল করতে থাকে। ছাত্র-ছাত্রীরা ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই‘ শ্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে থাকে। পুলিশ বাঁধা দিলে ছাত্র-ছাত্রীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। উপাচার্যের অনুরোধে ছাত্ররা ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে শুরু করলে পুলিশ কয়েক জন ছাত্রকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে গ্রেফতার করে। এত ক্ষুদ্ধ হয়ে ছাত্ররা পুনরায় তাদের কর্মসূচি শুরু করে। এক পর্যায়ে ছাত্ররা আইনসভায় যোগ দিতে আসা পরিষদের সদস্যদের বাধা দেয় এবং সভায় তাদের দাবি উত্থাপনের দাবি জানায়।

কিছু ছাত্র এরপর তাদের দাবি জানাতে পূর্ব বাংলা গণপরিষদ অবরোধ করতে যায়। কিছু ছাত্র বিল্ডিং এর ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ ছাত্রাবাসেও গুলিবর্ষণ করে। ঐদিন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার নিহত হন। আহতদের মধ্যে আবদুস সালাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ই এপ্রিল মারা যান, তিনি ছিলেন সেক্রেটারিয়েটের পিয়ন।

গণপরিষদের সদস্য মাওলানা আবদুর রহমান তর্কবাগিশ, শামসুদ্দীন আহমেদ খন্দকার এবং মশিউদ্দিন আহমেদ আরো বেশ কয়েকজনকে নিয়ে গণপরিষদের অধিবেশন ত্যাগ করে ছাত্রদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান। এই ঘটনার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন এক জাতীয় চেতনার জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পরে সারা দেশে। সারাদেশে ধর্মঘট শুরু হয়।

২২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। জনগণ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শোক র‍্যালি ও মিছিল করতে থাকে। এরপর অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের একটি বিশাল মিছিল কার্জন হলের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালায়, এতে সরকারি হিসেবে ৪ জন মারা যান। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে জানাজা এবং বিক্ষোভ মিছিল হয়। পুলিশের হামলার শিকার বিক্ষুদ্ধ কিছু জনতা রাজধানীর জুবিলী প্রেসে আগুন ধরিয়ে দেয়।  ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় মিছিলে পুলিশ হামলা চালায়। নবাবপুরে পুলিশের গুলিতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন নিহত হন। এইদিন মৃতদের মধ্যে অহিউল্লাহ নামক এক কিশোরও ছিলেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের নিহত হওয়ার জায়গায় ঢাকা মেডিকেলের ছাত্ররা একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে, যার উপরে কাগজে লেখা ছিল ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন আন্দোলনে নিহত শফিউর রহমানের পিতা। এটি ২৬শে ফেব্রুয়ারি সরকার গুঁড়িয়ে দেয়। পরে ১৯৬৩ সালে এই জায়গায় শিল্পী হামিদুর রহ্মানের নকশায় একটি কংক্রীটের স্থাপনা নির্মান করা হয়েছিলো।

বাংলার এই ভাষা আন্দোলনে নারীদের অনেক ভূমিকা রয়েছে। ডাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, কামরুন্নেসা স্কুলের ছাত্রীদের ভূমিকা ছিলো অগ্রগণ্য। এছাড়া ঢাকার বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা আন্দোলনে অংশ নেন। বেগম আফসারুন্নেসা, শামসুন্নাহার, রওসন আরা, যোবেদা খাতুন চৌধুরী, সৈয়দ লুতফুন্নেসা খাতুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, লিলি চক্রবর্তী, হাজেরা মাহমুদ, আনোয়ারা খাতুন, শাফিয়া খাতুনেরা ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন।

ভাষা আন্দোলন এর প্রতিক্রিয়া 

১৯৫২ এর ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় নিজেদের দোষ চাপা দিতে সরকার বিভিন্নভাবে আন্দোলনের বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করে। লিফলেট এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে সারাদেশে তারা তাদের কথা ছড়িয়ে দিতে থাকে। আবুল বরকত ও রফিকউদ্দিনের পরিবার হত্যা মামলা করতে চাইলে তা গ্রহন করা হয় না। এই বছরের ১৪ই এপ্রিল গণপরিষদের অধিবেশনে ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি উঠে আসে। মুসলিম লীগের সদস্যরা এর বিপক্ষে ভোট দিলে আলোচনা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে এই বছরের ৭ মে গণপরিষদে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান দল মুসলিম লীগের সদস্যরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে সমর্থন জানায়। ১৯৫৫ সালের আবারো ২১ ফেব্রুয়ারির আগে ১৪৪ ধারা জারি করে পাকিস্তান সরকার। ছাত্র ও সাধারণ জনগণ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জড়ো হয়। পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। 

১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই ভাষা আন্দোলন স্থায়ী হয়েছিলো। এই বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালনে সরকার বাঁধা দেয় না। সারা দেশব্যাপী পালিত হয় শহীদ দিবস। এরপর গণপরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিল পাশ করে। ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মধ্যে ফরিদপুরের আদেলউদ্দিন আহমদের উত্থাপন করা এক সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী উর্দু এবং বাংলা দুইটি ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটি ২৯ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের ২১৪(১) নাম্বার অনুচ্ছেদে জায়গা পায়, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং বাংলা”।

আইয়ুব খান তার সামরিক সরকারের আমলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করলেও তা সফল করতে পারেন নি। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের ১লা মার্চ আইয়ূব খান পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসাবে উল্লেখ করেন।

ভাষা আন্দোলন দিবস

২১ ফেব্রুয়ারিকে বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে ভাষা আন্দোলন দিবস বা রাষ্ট্রভাষা দিবস বা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশে এটি একটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করা হয় এবং এই দিনটিতে বাংলাদেশে সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশ সংবিধান বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস 

বাঙালীদের ভাষা আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয়ার জন্য ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কানাডায় বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম প্রাথমিকভাবে জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান। এরপর তাদের গঠিত ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ নামক সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দাবির পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায় করার চেষ্টা করা হয় যা একসময় সফল হয়।

জাতিসংঘের সংগঠন ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশের জমা দেয়া এবং অন্যান্য ২৮ টি দেশের সমর্থনে খসড়া প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহ যথাযথ মর্যাদায় পালন করছে। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৬৫ তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রস্তাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ।

২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মাতৃভাষা সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন, বিকাশ, চর্চা, প্রচার ও প্রসারে অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক’ চালু করেছে।

error: Content is protected !!