জেনে নিন বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হলে আপনি যেসব  সুযোগ সুবিধা পাবেন

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বর্তমানে অধিকাংশেরই কাঙ্খিত চাকরি বিভিন্ন সরকারি চাকরি। এর মধ্যে আবার উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের প্রধান পছন্দ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস এর চাকরি। প্রতিনিয়তই বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হওয়ার প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। তাই প্রত্যেকবার বিসিএস পরিক্ষার জন্য আবেদন এর সংখ্যা আগেরবারের চেয়ে বেশি হয়। দিনদিন এখানে প্রতিযোগিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

কেনো অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হতে চায়? এর পিছনে রয়েছে বিভিন্ন কারণ। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন প্রার্থী ৯ম গ্রেডের একজন প্রার্থী প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা বা গেজেটেড অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়ায় তারা  সবচেয়ে বেশি সরকারি সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকেন। বিসিএস ক্যাডারদের প্রাপ্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাই চাকরিপ্রার্থীদের বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre )  হওয়ার পিছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সাধারন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থীসহ সব শিক্ষার্থীরাই এখন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন এর এই চাকরি পেতে চায়।  

বিসিএস এর নিয়োগ পদ্ধতি

 বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হওয়ার বেশি আগ্রহের একটা প্রধাণ কারণ এর নিয়োগের স্বচ্ছতা। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই দূর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলেও বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় না।একজন আবেদনকারীকে বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হতে হলে ৩ টি প্রধান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। প্রথম ধাপ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হলে এরপর উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়। এরপর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীরা মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এবং এখানে পাশ করা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ নাম্বারধারীদেরকে বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre )  হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ভাইভায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ ভেরিফিকেশন পার করতে হয়। সর্বশেষে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশক্রমে সরকারি গেজেট বা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করেও যারা বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre )  হতে পারেন না তাদের মধ্যে থেকে অনেককেই বিসিএস নন-ক্যাডার এর বিভিন্ন পদে চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রিলিমিনারির জন্য আবেদন থেকে নিয়োগ পাওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাই হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। তাই অনৈতিকভাবে কারো এই চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ থাকে না বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হওয়ার আগ্রহ বেশি থাকে।

বিসিএস এ কোটা বৈষম্য না থাকা

আগে যে কোনো সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা ছিলো। বিসিএস এ মাত্র ৪৪ % পদ কোটাবিহীন প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ ছিলো। এতে করে অনেক মেধাবী আবেদনকারীরা চাকরি পেতো না, অথচ কোটা সুবিধা থাকার কারণে তুলনামূলক কম নাম্বার পেয়েও প্রতিবারই অনেক প্রার্থী নিয়োগ পেতো। পরবর্তীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর বিসিএস সহ প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা ব্যবস্থা বিলোপ করে ঘোষণা এসেছে। এতে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য কমে যাবে। উপযুক্ত মেধাবীরাই চাকরি পাবেন। কেউই বিশেষ কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন না, সবাইকে একই পদ্ধতিতে নিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এই বৈষম্য কমে যাওয়ার চাকরিপ্রার্থীদের বিসিএস তথা প্রথম শ্রেণির চাকরীতে ( BCS Cadre )  আগ্রহী হওয়ার অন্যতম কারণ।

সরকারি চাকরিতে উচ্চ বেতন

কয়েক বছর আগেও সরকারি চাকরিতে বেতন অনেক কম ছিলো। সামান্য বেতনের চাকরিতে তাই অনেকেই আসতে চাইতো না। অপরদিকে বেসরকারি খাতের বড় চাকরিতে বেতন কাঠামো ভালো ছিলো, তাই অধিকাংশ মেধাবীদের পছন্দ ছিলো বেসরকারি খাতের বিভিন্ন চাকরি। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ বেসরকারি চাকরীতে প্রথমদিকে বেতন অনেক কম থাকে। অনেক বেশি কাজ করেও অনেকেই মাসে ১২০০০-২০০০০ টাকার বেতনে চাকরি শুরু করেন। বর্তমান বাজারমূল্যের কথা চিন্তা করলে এই বেতন দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

এখন সরকারি চাকরির বেতন বেড়েছে, চাকরি প্রার্থীরা এখন সরকারি চাকরিতে আসার আগ্রহ পাচ্ছে। পুরনো বেতন কাঠামো পালটে কয়েক ধাপে বেতন বাড়ানোর এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি চাকরির বেতন স্কেল দ্বিগুন করার ফলে এখন বিসিএস ক্যাডাররা চাকরিতে ঢোকার পরেই প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) চাকরিতে ৯ম গ্রেডের বেতন কাঠামোতে নিয়োগ পান। যাতে বেসিক বেতন ২২০০০-৫৩০৬০ টাকা। চাকরিতে ঢোকার সময়েই মূল বেতন ২২ হাজার টাকার সাথে শুরুতেই একটি ইনক্রিমেন্ট সহ বেসিক বেতন ২৩ হাজার ১০০ টাকা পেয়ে থাকেন। এর ক্যাডারদের মধ্যে যাদের সরকারি নিবন্ধন এর প্রয়োজন যেমন, যেমন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী তারা  অতিরিক্ত আরেকটি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। স্নাতক ডিগ্রির সাথে যদি ইঞ্জিনিয়ারিং বা আর্কিটেকচার এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকে তাহলে তারা আবার শুরুতেই ২ টি ইনক্রিমেন্ট পান।  এর সাথে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা সহ বিভিন্ন ভাতা বাবদ মূল বেতনের প্রায় দ্বিগুন বেতন পেয়ে থাকেন বিসিএস ক্যাডাররা।

চাকরিতে নিশ্চয়তা

চাকরির নিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের বিসিএস এর দিকে আগ্রহী করে তোলে। দেশের অধিকাংশ চাকরি বেসরকারি খাতে হলেও বেসরকারি খাতের চাকরিতে তেমন কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। চাকরিজীবিরা যে কোনো মুহুর্তে চাকরি হারানোর ভয়ে থাকেন। কোম্পানি কোনো কারণে আর্থিকভাবে লোকসানের মূখে পড়লে গণহারে কর্মীদের ছাটাই করতে পারে। এক্ষেত্রে ভালো, দক্ষ কর্মী হলেও লাভ হয় না অনেক সময়। এজন্য চাকরি জীবনের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থীরা বেসরকারি চাকরিতে গেলেও পরবর্তীতে সরকারি চাকরীতে আসতে চান।

অপরদিকে সরকারি চাকরিতে চাকরি না যাওয়ার অনেকটা নিশ্চয়তা থাকে। বিশেষ কোনো ঘটনা ছাড়া সরকারি চাকরি চলে যাওয়ার ভয় থাকে না। খুব কম মানুষেরই সরকারি চাকরি বা বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হওয়ার পর চাকরীচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আর্থিক কেলেঙ্কারি বা বড় কোনো অপরাধে দোষী হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তি স্বরুপ ওএসডি (অফিদার অন স্পেশাল ডিউটি) করে রাখা হয় যাতে শাস্তিপ্রাপ্ত কোনো অফিসারকে দায়িত্ব শূন্য অবস্থায় রাখা হয়। পুরোপুরিভাবে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা খুবই কম।

বেসরকারি চাকরির তুলনায় সরকারি চাকরিতে চাকরি না যাওয়ার এই নিশ্চয়তা থাকায় এখন ডাক্তার, প্রকৌশলীদের প্রচুর পরিমাণে সরকারি চাকরীতে আসতে দেখা যাচ্ছে।

বিভিন্ন রকম ভাতা সুবিধা

বিসিএস ক্যাডাররা ( BCS Cadre ) তাদের মাসিক মূল বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, ভ্রমণভাতা, যাতায়াত সুবিধা, উৎসব ভাতা, নববর্ষ ভাতা, শিক্ষা সহায়ক ভাতা, আপ্যায়নভাতা, ঝুকিভাতা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), কার্যভারভাতা, পাহাড়িভাতা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) পেয়ে থাকেন।  

বাড়িভাড়া ভাতা

বিসিএস ক্যাডারদের মধ্যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মূল বেতনের ৫৫% হারে, অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার পৌর এলাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মূল বেতনের ৪৫% হারে, এর বাইরে অন্যান্য জেলা উপজেলায় নিয়োগ প্রাপ্ত হলে মূল বেতনের ৪০% হারে বাড়ি ভাড়া পেয়ে থাকেন। তবে সরকারি বাসস্থানে থাকা চাকরিজীবিরা বাড়ি ভাড়া ভাতা পান না।

শিক্ষা সহায়ক ভাতা

মূল বেতনের সাথে প্রতি মাসে প্রত্যেক কর্মকর্তা একজন সন্তানের জন্য ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ জন সন্তানের জন্য মোট ১০০০ টাকা শিক্ষা সহায়তা ভাতা পেয়ে থাকেন। কোনো সন্তান না থাকলে তারা এই ভাতা পাবেন না। আবার ২ জনের বেশি সন্তান থাকলেও সর্বোচ্চ ১০০০ টাকাই পাবেন, এর বেশি না। আবার সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানদের জন্য প্রায় প্রত্যেক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা বরাদ্দ থাকে।

উৎসব ভাতা

বিসিএস ক্যাডারগণ ( BCS Cadre ) অন্য সব সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বছরে দুইটি উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন, যা তাদের মূল বেতনের সমান। এছাড়া বাংলা নববর্ষ ভাতা হিসেবেও মূল বেতনের ২০% হারে ভাতা তারা পেয়ে থাকেন।

চিকিৎসা ভাতা

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ি বিসিএস ক্যাডারসহ ( BCS Cadre )  সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রত্যেক কর্মকর্তা- কর্মচারি প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।

বিনোদন ভাতা

এছাড়া তারা অতিরিক্ত ছুটি হিসেবে প্রতি দুই বছরে ১৫ দিন বেতনসহ ছুটি নিতে পারেন। এছাড়াও অরত্যেক সরকারি চাকরিজীবীর ন্যায় বিসিএস ক্যাডারগণও ( BCS Cadre ) প্রতি দুই বছরে একবার নিজের মূল বেতনের সমান টাকা বিনোদন ও শ্রান্তি ভাতা হিসেবে পেয়ে থাকেন। 

পাহাড়ি ভাতা

আরেকটি ভাতা হলো পাহাড়ি ভাতা। পার্বত্য তিন জেলা ও দেশের অন্য ১৬ টি দূর্গম উপজেলা অঞ্চলে নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০% হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। যা কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০০০ টাকা এবং কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা হয়ে থাকে।

ভ্রমণ ভাতা

কোনো সরকারি কাজে ভ্রমণ করলে বিসিএস ক্যাডারসহ ( BCS Cadre ) ১০ম গ্রেড (বেতন ২৯০০০ এর বেশি যাদের) থেকে ১ম গ্রেড পর্যন্ত সকল কর্মকর্তারা দৈনিক ভাতা বাবদ ৭০০ থেকে ১৪০০ টাকা পান। 

যাতায়াতের সময় ৫ম গ্রেড বা এর উপরের কর্মকর্তাদের জন্য ট্রেন ও জাহাজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসন বরাদ্দ থাকে। অন্য ১ম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য প্রথম শ্রেনির আসন বরাদ্দ থাকে। আর বাসে ভ্রমণ করার জন্য প্রথম শ্রেণির সব কর্মকর্তাদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসন বরাদ্দ থাকে। আবার ৫ম গ্রেড থেকে এবং এর উপরের যারা তারা বিমানের ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণের সুযোগ পান। ( নিচের দিকের সব গ্রেডের চাকরিজীবীদের জন্যও বাস, ট্রেনে বিভিন্ন পর্যায়ের টিকেটের ব্যবস্থা থাকে)।

বদলি ক্ষেত্রে চাকরিজীবী ও তার পরিবারের সব সদস্য ও মালামাল পরিবহনের খরচও সরকার বহন করে থাকেন।

আপ্যায়ন ভাতা

এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের সচিব ও প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তাগণ ৬০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত আপ্যায়ন ভাতা পান। প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তাগণ মাসিক ৩০০০ টাকা ডোমেস্টিক এইড এলাউন্সও পান।

বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) অন্যান্য সুবিধা

মাতৃত্বকালীন ছুটি

অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীদের মতোই বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) নারী কর্মকর্তাগণ ৬ মাস মাতৃকালীন ছুটি পান। এ সময় তারা পূর্ণ বেতন নিয়েই বাসায় থাকার সুযোগ পান।

দেখা যাচ্ছে বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) জন্য সরকার প্রদত্ত সুযোগসুবিধার অভাব নেই।

সুবিধা

এর বাইরেও বিসিএস ক্যাডারগণ ( BCS Cadre ) বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্বল্প সুদের বিনিময়ে (৫% সরল সুদ)  বাড়ি করার জন্য লোন নেয়া, গাড়ি কেনার জন্য সুদ বিহীন লোন নেয়া ইত্যাদি। গাড়ি কেনার সুদমুক্ত লোনের সাথে সাথে বিশাল বড় অংকের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষন ভাতা দেয়া হয় তাদের। প্রত্যেক কর্মকর্তা ড্রাইভারের বেতন, তেলের খরচ ও গাড়ি মেরামতের জন্য প্রতি মাসে ৪৫ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। গাড়ির পিছনে খরচ করার পরেও বেশ ভালো পরিমাণ টাকা প্রায়ই হাতে থাকে যায়।

কাজের পরিবেশ

সরকারি চাকরিজীবিদের কাজের পরিবেশ এখন অনেক ভালো বলা যায়। বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডাররা ( BCS Cadre ) ৯ম গ্রেডে জয়েন করার মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির চাকরিজীবির মর্যাদা পান। তাদের আলাদা অফিস কক্ষ থাকে। তাতে তারা নিজেদের মতো করে কাজ করতে পারেন। অফিসে কাজে সহায়তা করার জন্য অফিস সহকারি থাকে। অনেক ক্যাডাররা ( BCS Cadre ) ড্রাইভার সহ নিজস্ব গাড়ির সুবিধা পেয়ে থাকেন।

সামাজিক মর্যাদা

সামাজিক ভাবে সরকারি চাকরিজীবি বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়। শহর, গ্রাম সব সমাজের যে কোন পর্যায়েই তারা আলাদা গুরুত্ব পান। বিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষভাবেই এটা চোখে পড়ে। সরকারি চাকরি, বিশেষত বিসিএস ক্যাডাররা বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকেন।  

এছাড়া বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) অঘোষিত এক ধরণের ক্ষমতা থাকে দেশের মধ্যে। তারা যে কোনো অফিসে কাজ করতে গেলে তাদের যে কোনো কাজ আলাদা গুরুত্ব দিয়েই করে দেয়া হয়।

শিক্ষাবৃত্তি

বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) জন্য পড়ালেখার উদ্দেশ্য বিদেশে যেতে সরকারি বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া তুলনামূলক সহজ। সরকারিভাবেই ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) জন্য বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ রাখা হয়। আবার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এর মত কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশের বিসিএস ক্যাডাররা ( BCS Cadre ) এসব বৃত্তি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আসতে পারেন। এতে করে শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে কয়েক বছর বিদেশে থেকে ভ্রমন করাও সুযোগটাও তারা পান। বিশ্বের বিভিন্ন মানুষের সাথে মেশার ফলে বিশ্ব রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সম্পর্কে বিষদ জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।

বিদেশ ভ্রম

আরো অনেক সুবিধার সাথে সাথেবিদেশ ভ্রমণ ও বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) একটা বিশেষ সুবিধা। সব ক্যাডাররা সমান ভাবে সুযোগ না পেলেও পররাষ্ট্র ক্যাডাররা এই সুযোগ সবচেয়ে বেশি পেয়ে থাকেন। আবার অন্যান্য বিভিন্ন বিভাগের ক্যাডাররাও সরকারি বিভিন্ন কাজে, প্রশিক্ষণ নিতে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে চাকরিজীবনে অনেকেই অনেক বার করে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পান।

পেনশন সুবিধা

চাকরির শেষে সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল পেনশন সুবিধা। পেনশন সুবিধা বেসরকারি খাতে থাকে না। চাকরি শেষে বিসিএস ক্যাডাররা ( BCS Cadre ) অনেক বেশি পরিমান পেনশন পেয়ে থাকেন। প্রায় ৩০-৩৫ বছর চাকরি শেষে প্রায় প্রত্যেক ক্যাডারদেরই কয়েক ধাপ প্রমোশন ও ইনক্রিমেন্ট এর মাধ্যমে বেতন অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে এককালীন ও মাসিক হারে বড় অংকের টাকা পান সরকারি চাকরিজীবিরা। চাকরি কাল ২৫ বছর বা তার বেশি হলে মূল বেতনের ৯০% হারে পেনশন পাবেন, যা আগে ছিলো ৮০%। ২০ বছর বা ততোধিক চাকরির বয়স হলে প্রতি টাকার বিপরীতে ২৩০ টাকা হারে এককালীন আনুতোষিক পাবেন।

বিসিএস ক্যাডারদের ( BCS Cadre ) আনুতোষিক ও পেনসনের পরিমাণ কেমন হয় তার একটি সাধারণ হিসাব করা যাক, কোনো এক ব্যক্তি চাকরি শেষ করেন যখন তখন তার মূল বেতন ৭১২০০ টাকা। তিনি চাকরি করেছেন ২৫ বছরের বেশি। এবং তিনি বিনা বেতনে কোনো ছুটি ভোগ করেন নি।  এমন ক্ষেত্রে, তিনি ((৭১২০০ x ৯০%) ÷ ২) = ৩২০৪০ + ১৫০০ ( চিকিৎসা ভাতা) = ৩৩৫৮০ টাকা হারে মাসিক পেনশন পাবেন। আর ৬৫ বছরের উর্ধ্বে পেনশনাররা মাসিক চিকিৎসা ভাতা ২৫০০ টাকা পাবেন। তখন এক্ষেত্রে মাসিক পেনসন দাড়াবে ৩৪৫৮০ টাকা। আর এককালিন আনুতোষিক হিসেবে (৭১২০০ x ৯০%) ÷ ২) x ২৩০ = ৭৩৬৯২০০ টাকা পাবেন। আবার ছুটির হিসাবে এককালিন ল্যাম্পগ্রান্ট পাবেন চাকরি শেষে।   এর পরিমাণ হবে তার শেষ মূল বেতনের অর্জিত ছুটি (মাস) এর সমান টাকার গুনফল। যদি তার অর্জিত ছুটি ১৮ মাস হয় তাহলে ল্যাম্পগ্রান্ট এর পরিমাণ দাঁড়ায় (৭১২০০ x ১৮) = ১২৮১৬০০ টাকা।

আবার যে কোনো সরকারি চাকরিজীবী অবসরে গেলে পেনশন হিসেবে বছরে ২ বার নিট পেনশনের দ্বিগুন টাকা উৎসব ভাতা হিসেবে পাবেন।

চাকরি শেষে এই এককালীন টাকা আর মাসিক পেনশনের টাকা বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন হয়। তখন আর অন্য কারো উপর নির্ভর করতে হয় না।

বিসিএস বিভিন্ন ক্যাডারের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা

সিভিল সার্ভিসেরএকেক ক্যাডারের চাকরিজীবিরা একেক ধরণের বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। সব সেক্টরের ক্যাডাররা যে সমান সুবিধা পেয়ে থাকেন তা না।

পররাষ্ট্র ক্যাডারদের ক্যাডার তালিকায় সবচেয়ে উপরে থাকেন কারণ এখানে সবচেয়ে মেধাবীদের নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে।ফরেন ক্যাডারদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ বেশি ,কারণ এই ক্যাডারে পদ সংখ্যা অনেক কম থাকে। পররাষ্ট্র ক্যাডারদের চাকরিজীবনের একটা বড় সময় যায় বিদেশে। তারা বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে এবং মিশনে নিয়োগ পান। থার্ড সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ছয় বছরের জন্য দুই দেশে কাজ করার জন্য নিয়োগ পান। এরপর আবার তিন বছর দেশের মধ্যে পোস্টিং পান। দেশে থাকা কালীন সময়েও তারা অনেক বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পান। দূতাবাসে নিয়োগ হলে নিয়মিত বেতনের সাথে সাথে তারা ফরেন ভাতা হিসেবে মাসে ১২০০ আমেরিকান ডলার পেয়ে থাকেন। এর সাথে ২০০০০ ডলার বাৎসরিক বাসা ভাড়া, পরিবারের চিকিৎসার ৯০৫ পর্যন্ত ভাতা হিসেবে পেয়ে থাকেন, দুইজন ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ এবং মাসিক বিনোদন ভাতা পান।  পররাষ্ট্র ক্যাডাররা সৎভাবে সবচেয়ে রাজকীয়ভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। তাদের পরিবারের সদস্যরাও কূটনীতিকের সম্মান পান তার কর্মস্থলে। পররাষ্ট্র ক্যাডাররা অনেক বেশি বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ পান। তবে পররাষ্ট্র ক্যাডাররা বেশি গুরুত্ব পেলেও ক্ষমতা কম দেখাতে পাবেন।

প্রশাসন ক্যাডাররাই মূলত দেশের সব প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাদের   কাজের উপরেই দেশ অনেকাংশে নির্ভর করে। সাধারণত নিয়োগের ৭/৮ বছর পর প্রশাসন ক্যাডাররা উপজেলার নির্বাহী অফিসার এর দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। তখনই তারা সরকারি বাংলো, ড্রাইভার সহ গাড়ির সুবিধা পান। তাদের   ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে সহ এলাকায় অনেক বেশি ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারেন।  প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একতা বিশেষ দিক হল তারা  প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় সচিব পর্যন্ত যেতে পারেন। দেশের সব সচিবদের মধ্যে শুধু প্রশাসন ক্যাডার থেকেই প্রায় ৮০ ভাগ নিয়োগ পেয়ে থাকেন। অন্যান্য ক্যাডারদের সুযোগ কম থাকে। পররাষ্ট্র ক্যাডার না হলেও তারা  অনেক সময়ে বিদেশের বিভিন্ন মিশনে যেতে পারেন যাতে বেতন অনেক বেশি থাকে।  চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও তাদের   মধ্যে থেকে অনেকেই সরকারি বিভিন্ন উচ্চ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে থাকেন। 

এই ক্যাডারদের একটা দিক হলো চাকরির একটা লম্বা সময় তাদের   গ্রামাঞ্চলে থাকতে হয়, তবে অনেকেই শুরুতেই মন্ত্রনালয়ে নিয়োগ পান। বড় নিয়োগ হয় বলে তাদের   পদোন্নতি হওয়া একটু জটিল।

এরপর আসে পুলিশ ক্যাডার। এই ক্যাডার অনেকেই প্রথম পছন্দ দিয়ে থাকেন। এর প্রধাণ একটি কারণ হলো অনেক বেশি ক্ষমতা থাকে পুলিশ ক্যাডারদের। তারা  অনেক রকম সরকারি সুবিধা পেয়ে থাকেন, যেমন, রেশন সুবিধা, সরকারি বাংলো, গাড়ি ইত্যাদি। তারা  সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারেন। তবে এই ক্যাডারদের কাজের চাপ অনেক থাকে। বলা যায় পুলিশদের কোনো ছুটি নেই। যে কোনো দিন, যে কোনো সময় তাদের কর্মক্ষেত্রে হাজির থাকতে হতে পারে। পুলিশে উপরের দিকে পদ কম থাকায় একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত গিয়ে তাদের প্রমোশন কমে যায়। খুব অল্প কিছু অফিসারই প্রমোশন সুবিধা পান।

কাস্টম ক্যাডারদের ক্ষমতা ব্যাবহারের সুযোগ কম। এই ক্যাডাররা ঢাকার বাইরে নিয়োগ পান বেশি। বিভিন্ন পোর্ট এ কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে। একতা বিশেষ সুবিধা হলো বৈধ উপায়েই সফল্ভাবে কাজ করতে পারলে অনেক উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। চোরাচালান, ফাঁকি এসব সরকারকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন হিসেবে পান। গাড়ি, বাসস্থানের সুবিধা এনারা ভালোই পেয়ে থাকেন।

কর বা ট্যাক্স ক্যাডাররাও কাস্টম ক্যাডারদের মতো অর্থ মন্ত্রণালয়ের উইং হিসেবে কাজ করেন। চাকরির প্রথম দিকে খুব বেশি সুযোগ সুবিধা পান না। তাদের  ও সরকারি কমিশন হিসেবে অতিরিক্ত বৈধ আয়ের সুযোগ রয়েছে। কর ফাঁকি ধরতে পারেলে তাঁদেরকে কমিশন দেয়া হয়। প্রশাসনিক ক্ষমতা কম থাকলেও পদোন্নতির সাথেসাথে কিছু বাড়ে।

অডিট বা নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডারদের কাজের চাপ মোটামুটি ভালোই থাকে। প্রমোশন ভালই হয়। দেশে, বিদেশে অনেক ভ্রমণের সুযোগ পান। সব মহলেই তাদের   একটা বিশেষ মর্যাদা আছে কারণ অডিট ক্যাডারদের কাজ থাকে সরকারের সব বিভাগেই। সব প্রতিষ্ঠানের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করাই অডিট ক্যাডারদের কাজ। ঢাকায় পোস্টিং বেশি হয়, এছাড়া ডিভিশনাল পোস্টিংও অনেক। কোয়ার্টার, যাতায়াত সুবিধা ভালোই পান।

সমবায় ক্যাডার, তথ্য ক্যাডারদের নিয়োগ সবসময় বড় শহরেই হয়ে থাকে যেহেতু গ্রামের দিকে তাদের   পদ থাকে না। পদ সংখ্যাও কম তাদের। গাড়ি বা বাসস্থান সুবিধা সবার আগে পান তারা।   

সাধারণ ক্যাডারদের চেয়ে টেকনিক্যাল ক্যাডারদের সুবিধা বা ক্ষমতা অনেকক্ষেত্রেই আলাদা হয়। বিশেষ করে ক্ষমতার বিচারে টেকনিক্যাল ক্যাডাররা পিছিয়ে থাকেন। বিভিন্ন প্রকৌশলি, কৃষি, পশু চিকিৎসক, সাধারণ চিকিৎসা বা ডেন্টাল ক্যাডারদের তেমন ক্ষমতা থাকে না। 

টেকনিক্যাল ক্যাডারদের মধ্যে সাধারণত বড় নিয়োগ পান কৃষি সেক্টরে, চিকিৎসা সেক্টরে এবং শিক্ষা খাতে। চিকিৎসা ক্যাডারদের একটা বিশেষ সুবিধা বলা যায় এর তা হলো প্রাইভেটলি বিভিন্ন জায়গায় প্রাকটিস এর মাধ্যমে তারা  অতিরিক্ত উপার্জন করার সুযোগ পান। কিন্তু যদি অন্যান্য সুবিধার কথা বলেন তাহলে তাদের   তেমন সুবিধা নেই। নিরাপত্তা, বাসস্থান, যাতায়াত সুবিধা কোনোকিছুই তারা  পান না। তাদের   অনেক বছর গ্রামে থাকতে হয়, সহজে পদোন্নতি পান না। তাই ইদানীং অনেক চিকিৎসককেই এখন পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ সহ বিভিন্ন সাধারন ক্যাডারে যেতে দেখা যায়।

শিক্ষা ক্যাডারদের চাকরি সবচেয়ে কম কষ্টের বলা যায়। কাজের প্রেশার কম থাকে। কলেজের শিক্ষক হিসেবে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও তাদের সংখ্যা এত বেশি যে তাদেরকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয় না। তারা বাসস্থান, গাড়ি, নিরাপত্তা এমন কোনো সুবিধাই পান না।

এই ধরণের বিভিন্ন কারণে বিসিএস ক্যাডার ( BCS Cadre ) হওয়ার প্রতি দেশের তরুণ সমাজের আগ্রহ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

error: Content is protected !!