রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্যিকগণ

আধুনিক যুগের সাহিত্য রচনায় রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্যিকগণ রেখেছেন অসামান্য অবদান। রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্যিকদের শ্রেষ্ঠ কিছু রচনা নিম্নে আলোচনা করা হলো-

মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ (১৮৬৯-১৯৬৮)

রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্যিক মাওলানা আকরাম খাঁ-এর শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধগ্রন্থ ‘মোস্তফা চরিত’। গ্রন্থটি হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর জীবনী। তাঁর অন্যান্য প্রবন্ধ- সমস্যা ও সমাধান, মুক্তি ও ইসলাম।

রাজশেখর বসু (১৮৮০-১৯৬০)

রাজশেখর বসুর ছদ্মনাম ‘পরশুরাম’। তিনি হাস্যরসিক গল্পকার হিসেবে পরিচিত। রাজশেখর বসু সংযমস্নিগ্ধ রসিকতা ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক পরিবেশনে সিদ্ধ শিল্পী। ধর্মের মিথ্যাচার, অলস ভাববিলাস, ভন্ডামি প্রভৃতিকে তিনি জ্বালাহীন কৌতুকের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করে সমাজ ও জীবনের বিচিত্র অসংগতি উন্মোচন করেছেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বিরিঞ্চি বাবা’, ভারতবর্ষ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

রাজশেখর বসু’র ছোটগল্প- কজ্জলি, বিরিঞ্চি বাবা, গড্ডালিকা, হনুমানের স্বপ্ন, কৃষ্ণকাল, নীলতারা আনন্দবাই, দুরস্তরী মায়া।

অনুবাদ- রামায়ণ, মহাভারত

সংকলন ও সম্পাদনা- চলন্তিকা অভিযান

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯)

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রধানত ভাষাতত্ত্ববিদ। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ- বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, বাংলা সাহিত্যের কথা, ভাষা ও সাহিত্য, ইকবাল।

গল্প- রকমারি গল্প সঞ্চয়ন

অনুবাদ গ্রন্থ- শিকওয়াহ, জওয়াব-ই-শিকওয়াহ, দীওয়ান-ই-হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-উমার খয়্যাম, মহাবাণী, অমিয় বাণী শতক।

সম্পাদনা করেন- আঙুর পত্রিকা ও বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০)

রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্যিকগণ এর মধ্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম। তিনি গ্রামের প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন ও মানবজীবনকে সৃষ্টির একক প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর মুক্ত ভাবনার আশ্রয়ে বাংলার অশিক্ষা, দারিদ্র্য, লাঞ্ছিত, রোগাচ্ছন্ন গ্রামীণ জীবনযাপন আপন স্বভাবকে অতিক্রম না করেও এক বৈশ্বিক মাত্রা অর্জন করেছে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিলিট উপাধি দেয়। তাঁকে শরৎচন্দ্র পরবর্তী বাংলার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তাঁর সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি ও মানবজীবন সম্পর্কে চিরন্তন বিবৃতি। তৃণাঙ্কুর (১৯৪৩) তাঁর আত্মজীবনিমূলক গ্রন্থ।

উপন্যাস- পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক, আদর্শ হিন্দু হোটেল, ইছামতি, অশনি সংকেত, দেবযান, বিচিত্র জগৎ, অভিযাত্রিক, বিপিনের সংসার ইত্যাদি

ছোটগল্প- মৌরিফুল, যাত্রাবদল, জন্মও মৃত্যু, কিন্নর দল, বিধু মাস্টার

পথের পাঁচালী ও অশনি সংকেত উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। পথের পাঁচালী উপন্যাসের চরিত্র- অপু, দূর্গা, হরিহর, সর্বজয়া।

ইব্রাহিম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮)

গ্রন্থ- আনোয়ার পাশা, ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৪)

আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ। তিনি দৈনিক মোহাম্মদী, সওগাত ও দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি এদেশে প্রথম ভাষা শহিদ মিনার উদ্বোধন করেন ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। তাঁর অনুবাদ গ্রন্থ- অনাবাদি জমি।

আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৭-১৯৭৯)

একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তিনি বাংলা সাহিত্যে রম্যগল্পের সূচনা করেন।রাজনৈতিক জীবনে তিনি যুক্তফ্রন্ট (১৯৫৪) মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।

উপন্যাস- সত্যমিথ্যা, জীবনক্ষুধা, আবেহায়াত;

গল্পগ্রন্থ-আসমানী পর্দা, আয়না, ফুড কনফারেন্স;

প্রবন্ধ- আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু, পাক বাংলার কালচার;

শিশু সাহিত্য- গালিভারের সফরনামা, কাসাসুল আম্বিয়া, আয়না, ফুড কনফারেন্স।

ড. কাজী মোতাহের হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১)

ড. কাজী মোতাহের হোসেন-এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠকীর্তি ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, দাবাড়ু, সংগীতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী।তিনি ‘শিখা’ পত্রিকার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ হলো- সঞ্চয়ন, নজরুল কাব্য পরিচিতি, গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস, নির্বাচিত প্রবন্ধ, আলোক বিজ্ঞান।

তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)

তারাশঙ্কর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। উপন্যাসে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর লেখায় বিশেষভাবে পাওয়া যায় বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের সাওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউড়ি, ডোম, গ্রাম্য কবিয়াল সম্প্রদায়-এর কথা বলা হয়েছে। গ্রাম জীবনের ভাঙনের কথা, নগর জীবনের বিকাশের কথা, মানুষের মহত্ব তাঁর রচনার মুলধারা।

উপন্যাস- চৈতালি ঘূর্ণি, পাষাণপুরী, নীলকণ্ঠ, রাইকমল, প্রেম ও প্রয়োজন, আগুন, ধাত্রীদেবতা, কালিন্দী, গণদেবতা, মন্বন্তর, পঞ্চগ্রাম, কবি, সন্দীপন পাঠশালা, ঝড় ও ঝরাপাতা, অভিযান, পদচিহ্ন, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, নাগিনী কন্যার কাহিনী, আরোগ্য নিকেতন, না, চাপাডাঙ্গার বউ, পঞ্চপুত্তলী, কালান্তর, বিচারক, কালবৈশাখী।

প্রবন্ধ- সাহিত্যের সত্য, রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার পল্লী, আমার কালের কথা, আমার সাহিত্য জীবন, বৈশাখের স্মৃতি ইত্যাদি।

ছোটগল্প- ছলনাময়ী, জলসাঘর, রসকলি, তিন শূন্য, প্রতিধ্বনি, বেদেনী, তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠ গল্প, শ্রীপঞ্চমী, তপোভঙ্গ, দীপার প্রেম, পঞ্চকন্যা।

ভ্রমণকাহিনি- ভারতবর্ষ ও চীন

মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪)

প্রবন্ধগ্রন্থ- বিদায় হজ্জ্ব, পারস্য প্রতিভা, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ধারা, নবীগৃহ সংবাদ, মানুষের মন, মানুষের ধর্ম।

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৯-১৯৭৯)

‘বনফুল’ হলো বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যাইয়ের ছদ্মনাম। তিনি বাংলা জীবনী নাটক রচনার পথিকৃৎ। তাঁর রচনায় পরিকল্পনার মৌলিকতা, তীক্ষ্ণ মননশীলতা ও মানবচরিত্রের বৈচিত্র্য পাঠকের বিস্ময় সৃষ্টি করে। বিচিত্র মানুষের চরিত্র চিত্রণে তাঁর দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি উপন্যাসের আঙ্গিক বা রূপরীতির নানারূপ পরীক্ষা নিরীক্ষায় বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছেন।

উপন্যাস- তৃণখণ্ড, বৈতরণীর তীরে, নিরঞ্জনা, ভুবন সোম, মহারাণী, অগ্নীশ্বর, মানসপুর, এরাও আছে, নবীন দত্ত, হরিশ্চদ্র, সে ও আমি, কৃষ্ণপক্ষ, সন্ধিপূজা, হাটে বাজারে, কন্যাসু।

গল্পগ্রন্থ- বনফুলের গল্প, বনফুলের আরো গল্প, বাহুল্য, বিন্দু-বিসর্গ, অদৃশ্য লোকে, তন্বী।

‘বনফুল’ ছদ্মনামে তিনি ‘মালঞ্চ’ ও ‘পরিচারিকা’ পত্রিকায় লিখতেন।

তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম অণুগল্প রচনা করেন।

মোতাহার হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬)

মোতাহার হোসেন চৌধুরী মুক্তির বুদ্ধি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

প্রবন্ধ- সংস্কৃতি কথা।

অনুবাদ- সভ্যতা, সুখ।

‘সংস্কৃতি কথা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ। মোতাহার হোসেন চৌধুরী এই প্রবন্ধে সংস্কৃতির স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, “ধর্ম সাধারণ লোকের সংস্কৃতি, আর সংস্কৃতি শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম”।

জসীম উদদীন (১৯০৩-১৯৭৬)

উপন্যাস- বোবা কাহিনী

গল্প- বাঙ্গালির হাসির গল্প

স্মৃতিকথা- ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়, যাদের দেখেছি

শিশুতোষ গ্রন্থ- হাসু, এক পয়সার বাঁশি, ডালিম কুমার

ভ্রমণকাহিনী- চলে মুসাফির

নীহাররঞ্জন রায় (১৯০৩-১৯৮১)

গ্রন্থ- বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)

সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪)

অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনায় পাওয়া যায় সুরসিক সাহিত্যিকের দুর্লভ প্রতিভার বিস্ময়কর ক্ষমতা।জীবনের ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা তাঁর গল্পে রূপায়িত হয়েছে। তিনি হাসির রাজা হিসেবে পরিচিত। তাঁর ভ্রমণকাহিনিমূলক রচনার নাম ‘দেশে বিদেশে’। ‘চাচাকাহিনী’ তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।

উপন্যাস- অবিশ্বাস্য, শবনম, তুলনাহীনা, শহর-ই-ইয়ার

গল্পগ্রন্থ- চাচাকাহিনী, পঞ্চতন্ত্র, ময়ুরকণ্ঠী, ধূপছায়া, জলে ডাঙ্গায়, চতুরঙ্গ, পরশ পাথর, পাদটীকা ইত্যাদি।

রম্যরচনা- পঞ্চতন্ত্র, ময়ুরকণ্ঠী

আবুল ফজল (১৯০৫-১৯৮৩)

আবুল ফজল ব্যক্তিগত জীবনে অধ্যাপনা করতেন। তিনি ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। তিনি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

উপন্যাস- চৌচির, সাহসিকা, রেখাচিত্র, রাঙা প্রভাত

error: Content is protected !!