ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সাহিত্য

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বাঙালীর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চলুন দেখে নেই মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্কে বিস্তারিত-

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সাহিত্য

মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা জাতীয় জীবনে সবক্ষেত্রে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে অসংখ্য উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি বাঙালী জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার চিত্র এসব সাহিত্যকর্মে রূপায়িত হয়েছে।

শওকত ওসমান

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গ্রন্থ রচনায় শওকত ওসমানের নাম অগ্রগণ্য। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাঙালীর সংগ্রাম ও সাধনার পরিচয় লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি সাহিত্য রচনায় প্রয়াসী হয়েছেন।

উপন্যাস-

দুই সৈনিক, নেকড়ে অরণ্য, জলাংগী

ছোটগল্প-

জন্ম যদি তব বঙ্গে, এবং তিন মির্জা, ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী, রক্তচিহ্ন, জননী : জন্মভূমি, ক্ষমাবতী

গল্পগ্রন্থ-

কালরাত্র, খন্ডচিত্র, জয় বাংলার জয়, শেখের সম্বরা

মেজর রফিকুল ইসলাম

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ-

একাত্তরের বিজয় গাঁথা, প্রতিরোধের প্রথম প্রহর, মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবী, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে

নীলিমা ইব্রাহীম

গ্রন্থ-

আমি বীরাঙ্গনা বলছি [মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত, নির্যাতিত নারীর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে]

হুমায়ুন আহমেদ

গ্রন্থ-

আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, ১৯৭১, বহুব্রীহি

  • ‘আগুনের পরশমণি’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় এবং তা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের মর্যাদা লাভ করে।

সুফিয়া কামাল

স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ-

একাত্তরের ডায়েরী

  • সুফিয়া কামাল বাংলা সাহিত্যের প্রধান মহিলা কবি
  • তিনি মহিয়সী নারী হিসেবে পরিচিত
  • গভীর বেদনাবোধ তাঁর সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য

সেলিনা হোসেন

গ্রন্থ-

হাঙর নদী গ্রেনেড, যুদ্ধ, একাত্তরের ঢাকা

  • বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে সেলিনা হোসেন মহিলাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার।

সৈয়দ শামসুল হক

গ্রন্থ-

দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, নিষিদ্ধ লোবান, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, এক মুঠো জন্মভূমি

  • ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়।

জাহানারা ইমাম

গ্রন্থ-

একাত্তরের দিনগুলি, বুকের ভিতর আগুন, বিদায় দে মা ঘুরে আসি, Of Blood and Fire

  • তিনি ‘শহিদ জননী’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।
  • মুক্তিযুদ্ধে তাঁর স্বামী ও ছেলে রুমি শহিদ হয়েছেন।

এম আর আখতার মুকুল

গ্রন্থ-

একাত্তরের বর্ণমালা, ওরা চারজন, জয়বাংলা, বিজয় একাত্তর, আমি বিজয় দেখেছি

  • ‘মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র’ তাঁর সম্পাদিত বিশিষ্ট গ্রন্থ

 

হাসান হাফিজুর রহমান

কাব্যগ্রন্থ-

বিমুখ প্রান্তর(১৯৬৩), আর্ত শব্দাবলী(১৯৬৮), অন্তিম শরের মতো(১৯৬৮), যখন উদ্যত সঙ্গীন (১৯৭২), বজ্রে চেরা আঁধার আমার(১৯৭৬), শোকার্ত তরবারী(১৯৮২), আমার ভেতরের বাঘ(১৯৮৩) ইত্যাদি।

আবদুল গাফফার চৌধুরী

গ্রন্থ-

ইতিহাসের রক্ত পলাশ, আমরা বাংলাদেশী বা বাঙালী, বাংলাদেশ কথা কয়

 

মমতাজউদ্দিন আহমদ

গ্রন্থ-

সাত ঘাটের কানাকড়ি, বকুলপুরের স্বাধীনতা

শাহরিয়ার কবির

গ্রন্থ-

একাত্তরের যীশু

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

উপন্যাস-

একটি কালো মেয়ের কথা

  • এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে কলকাতার পত্রিকা ‘উল্টোরথ’ এর পূজা সংখ্যায়।
  • এই উপন্যাসের নায়ক ডেভিড, নায়িকা নাজমা, ২৫মার্চ কালোরাতে তারা সীমান্ত অতিক্রমকালে ধরা পড়ে এবং ডেভিডকে গুপ্তচর সন্দেহে পুলিশ গেফতার ও নির্যাতন করে।
  • এই উপন্যাসে আইয়ুব শাসন, বঙ্গবন্ধু, টিক্কা খান, ইয়াহিয়াসহ সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদিত গ্রন্থ পরিচিতি-

  • বাংলাদেশ কথা কয়(১৯৭১): সম্পাদক- আবদুল গাফফার চৌধুরী
  • মুক্তিযুদ্ধের গল্প(১৯৮৩): সম্পাদক- আবুল হাসনাত
  • মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫): সম্পাদক- হারুন হাবিব
  • মুক্তিযোদ্ধার গল্প(১৯৯১): বিপ্রদাস বড়ুয়া

ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক সাহিত্য ও সাহিত্যিক

মুনীর চৌধুরী

গ্রন্থ-

কবর(১৯৬৬), দন্ডকারণ্য(১৯৬৬), পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য(১৯৬৯)

  • মুনীর চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন।
  • ১৯৪৩ সালে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘে যোগদান করেন।
  • ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
  • ১৯৫২ সাকের ২১শে ফেব্রুয়ারির হত্যাকান্ড ও পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদে কারাভোগ করেন জননিরাপত্তা আইনে।
  • ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি কারাগারে থাকাকালীন ‘কবর’ নাটকটি রচনা করেন।
  • ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নাটকটি ডাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দীদের দ্বারা অভিনীত হয়।
  • বাংলা টাইপ রাইটিং এর কী-বোর্ড ‘মুনীর অপটিমা’ উদ্ভাবন করেন ১৯৬৫ সালে।

মাহবুবুল আলম চৌধুরী

  • তিনি ‘মাসিক সীমান্ত’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
  • অমর একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’-এর রচয়িতা মাহবুবুল আলম চৌধুরী।

ভাষা আন্দোলন এর উল্লেখযোগ্য কবিতা-

  • কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি- মাহবুবুল আলম চৌধুরী
  • ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়- আব্দুল লতিফ
  • কোন এক মাকে- আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
  • স্মৃতিস্তম্ভ- আলাউদ্দীন আল আজাদ
  • বর্ণমালা, আমার দুঃখীনি বর্ণমালা- শামসুর রাহমান

ভাষা আন্দোলন এর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস-

  • আরেক ফাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারি- জহির রায়হান
  • আর্তনাদ- শওকত ওসমান
  • নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি, যাপিত জীবন- সেলিনা হোসেন

ভাষা আন্দোলন এর উল্লেখযোগ্য গল্প-

  • একুশের গল্প- জহির রায়হান
  • মৌন নয়- শওকত ওসমান
  • হাসি- সাইয়িদ আতিকুল্লাহ
  • দৃষ্টি- আনিসুজ্জামান
  • পলিমাটি- সিরাজুল ইসলাম
  • অগ্নিবাক- আতোয়ার রহমান
  • আরো একজন-সৈয়দ শামসুল হক
  • বিবরবাসী- নাসরিন জাহান
  • মানুষের মুখ- পারভেজ হোসেন

যা কিছু প্রথম-

প্রথম কবিতা-

কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি- মাহবুবুল আলম চৌধুরী

প্রথম উপন্যাস-

আরেক ফাল্গুন- জহির রায়হান

প্রথম নাটক-

কবর- মুনীর চৌধুরী

প্রথম ছোটগল্প-

একুশের গল্প- জহির রায়হান

প্রথম চলচ্চিত্র-

জীবন থেকে নেওয়া- জহির রায়হান

  • এ চলচ্চিত্রে প্রথম ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যবহার করা হয়।

প্রথম সম্পাদিত গ্রন্থ-

একুশে ফেব্রুয়ারি- হাসান হাফিজুর রহমান

  • ১৯৫৩ সালে এই সাহিত্য সংকলনটি প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের তিন সপ্তাহের মধ্যেই পাকিস্তান সরকার তা বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।
error: Content is protected !!