বাংলা ব্যাকরণের সমাস চেনার সহজ উপায়

স্কুলে যখন সমাস পড়ানো হত, তখন স্যারেরা একটু দুষ্টুমী করেই বলতেন সমাস শিখতে নাকি ছয় মাস লাগে। কথাটি দুষ্টামীর ছলে বলা হলেও একটু বেশিই সত্যি। ৬ মাস তো দূরে থাক এত বছরেও শিখা হলো না কোনটা কোন সমাস। কিছু সহজ নিয়ম মেনে সমাস চেনার চেষ্টা করা যাক-

  • দ্বিগু সমাস কিভাবে চিনবেন ?

আচ্ছা, দ্বিগু শব্দের ‘দ্বি’ মানে কী? আমরা ২ বুঝাতে ‘দ্বি’ শব্দটি ব্যবহার করি। ২ একটি সংখ্যা। তাহলে যে শব্দে সংখ্যা প্রকাশ পাবে এখন থেকে সেটাকেই ‘দ্বিগু’ সমাস বলে ধরে নিবেন। যেমন- পরীক্ষায় আসলো ‘শতাব্দী’ কোন সমাস? শতাব্দী মানে হল ‘শত অব্দের সমাহার’। অর্থাৎ প্রথমেই আছে ‘শত’ মানে একশ, যা একটি সংখ্যা। সুতরাং এটি দ্বিগু সমাস। একইভাবে ত্রিপদী (তিন পদের সমাহার)এটিও দ্বিগু সমাস। কারণ এখানেও একটি সংখ্যা (৩) আছে। এবার যেকোন ব্যাকরণ বই নিয়ে দ্বিগু সমাসের যত উদাহরন আছে সব এই সুত্রের সাহায্যে মিলিয়ে নিন।

  • এবার আসুন কর্মধারয় সমাসে। খুব বেশি আসে পরীক্ষায় এখান থেকে।

কর্মধারয় সমাসে ‘যে /যিনি/যারা’ এই শব্দগুলো থাকবেই। যেমন: চালাকচতুর – এটি কোন সমাস? চালাকচতুর মানে ‘যে চালাক সে চতুর’। এখানে ‘যে’ কথাটি আছে, অতএব এটি কর্মধারয় সমাস।

কর্মধারয় সমাস ৪ প্রকার। মুলত এই ৪ প্রকার থেকেই প্রশ্ন বেশি হয়। প্রথমেই আসুন মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস চিনি। নামটা খেয়াল করুন, মধ্যপদলোপী। মানে মধ্যপদ অর্থাৎ মাঝখানের পদটা লোপ পাবে মানে চলে যাবে। সহজ করে বললে হয়, যেখানে মাঝখানের পদটা চলে যায় সেটিই মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস। যেমনঃ সিংহাসন -কোন সমাস? সিংহাসন মানে ‘সিংহ চিহ্নিত যে আসন’। তাহলে দেখুন এখানে ‘সিংহ চিহ্নিত যে আসন’ বাক্যটি থেকে মাঝখানের ‘চিহ্নিত’  শব্দটি লোপ পেলে হয় ‘সিংহাসন’।

উপমান কর্মধারয় সমাস কিভাবে চিনবেন? যদি ২টি শব্দ তুলনা করা যায় তবে সেটি হবে উপমান কর্মধারয় সমাস। যেমনঃ তুষারশুভ্র – কোন সমাসের উদাহরন? এটি পরীক্ষায় অনেকবার এসেছে। শব্দটি খেয়াল করুন “তুষারশুভ্র “। তুষার মানে বরফ, আর শুভ্র মানে সাদা। বরফ তো দেখতে সাদা। তাহলে তো এটি তুলনা করা যায়। অতএব এটি উপমান কর্মধারয়। একইভাবে “কাজলকালো “এটিও উপমান কর্মধারয় সমাস। কারণ কাজল দেখতে তো কালো রঙেরই হয়। তার মানে তুলনা করা যাচ্ছে। অতএব এটি উপমান কর্মধারয়।

এটি অন্যভাবে ও মনে রাখা যায়। উপমান মানে Noun + Adjective. যেমন- ‘তুষারশুভ্র’ শব্দটির তুষার মানে বরফ হল Noun, আর শুভ্র মানে সাদা হল Adjective। ‘কাজলকালো’ শব্দটির কাজল হল Noun, এবং কালো হল Adjective। অতএব Noun + Adjective = উপমান কর্মধারয় সমাস।

উপমিত কর্মধারয় মানে যেটা তুলনা করা যাবে না। বিগত বছরের একটি প্রশ্ন ছিল: সিংহপুরুষ – কোন সমাসের উদাহরণ? খেয়াল করুন শব্দটি। ‘সিংহপুরুষ’ থেকে পাই, সিংহ আর পুরুষ। আচ্ছা সিংহ কি কখনো পুরুষ হতে পারে নাকি পুরুষ কখনো সিংহ হতে পারে? একটা মানুষ আর অন্যটা জন্তু, কেউ কারো মত হতে পারেনা। অর্থাৎ তুলনা করা যাচ্ছে না। যেহেতু তুলনা করা যাচ্ছেনা, অতএব এটি উপমিত কর্মধারয় সমাস। ‘চন্দ্রমুখ’ শব্দটি কোন সমাস? খেয়াল করুন, মুখ কি কখনো চাঁদের মত হতে পারে, নাকি চাঁদ কখনো মুখের মত হতে পারে? কোনোটাই কোনটার মত হতে পারেনা। অর্থাৎ তুলনা করা যাচ্ছে না। তার মানে যেহেতু তুলনা করা যাচ্ছেনা। অতএব এটি উপমিত কর্মধারয় সমাস।

এটিও অন্যভাবে মনে রাখা যায়। উপমিত মানে Noun+ Noun. যেমন –‘পুরুষসিংহ’ শব্দটির পুরুষ ও সিংহ দুটোই Noun, অর্থাৎ Noun+ Noun. একইভাবে, ‘চন্দ্রমুখ’ শব্দটির চন্দ্র ও মুখ দুটিই Noun, অর্থাৎ Noun+ Noun.  অতএব Noun+ Noun= উপমিত কর্মধারয় সমাস।

বাকি থাকল রুপক কর্মধারয় সমাস। এটিও খুব সোজা। রুপ- কথাটি থাকলেই রুপক কর্মধারয়। যেমনঃ বিষাদসিন্ধু -এটি কোন সমাস? ‘বিষাদসিন্ধু’ কে বিশ্লেষণ করলে হয় ‘বিষাদ রুপ সিন্ধু’। যেহেতু এখানে ‘রুপ’ কথাটি আছে, অতএব এটি রুপক কর্মধারয় সমাস। একইভাবে মনমাঝি –‘মনরুপ মাঝি’,  ক্রোধানল –‘ক্রোধ রুপ অনল’, এগুলো রুপক কর্মধারয় সমাস।

  • এবার আসুন দ্বন্দ্ব সমাস শিখি। যদি পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ের অর্থ প্রাধান্য পায় তবে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস হিসেবে ধরে নিবেন। যেমনঃ ‘মা-বাবা’ শব্দটি বিশ্লেষণ করলে হয় ‘মা ও বাবা’। এখানে দুটি শব্দই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘মা-বাবা’ দ্বন্দ্ব সমাস। একইভাবে দিনরাত, দা-কুমড়া, নয়-ছয় এগুলোও দ্বন্দ্ব সমাস।
  • অব্যয়ীভাব সমাসও দ্বন্দ্ব সমাসের মতো করে চেনা যায়। অব্যয়ীভাব সমাসে শুধুমাত্র পূর্বপদের অর্থ প্রাধান্য পায়। যেমনঃ ‘গরমিল’ শব্দে পূর্বপদ ‘গর’ এবং পরপদ ‘মিল’। কিন্তু ‘গরমিল’ বলতে মিল না থাকাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ‘গর’ শব্দের উপর জোর দেয়া হয়েছে। এটি অন্যভাবেও মনে রাখা যায়- উপসর্গ+বিশেষ্য হলেই অব্যয়ীভাব সমাস হবে। এখানে ‘গর’ একটি উপসর্গ যার অর্থ ‘অভাব’। অর্থাৎ গরমিল=মিলের অভাব। তাই এটি অব্যয়ীভাব সমাস।
  • বহুব্রীহি সমাস চেনার সহজ উপায় হলো এখানে পূর্বপদ বা পরপদ কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে ভিন্ন অর্থ বুঝায়। ‘যার/যাহার’ কথাটি থাকবে। অনেক সময় আমরা দ্বিগু সমাসের সাথে বহুব্রীহি সমাস মিলিয়ে ফেলি। এক্ষেত্রে মূল পার্থক্য হলো, পূর্বে সংখ্যা বসেও ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে বহুব্রীহি সমাস। যেমনঃ চৌচালা= চার চাল আছে যার। প্রথমে চার শব্দটি থাকলেও চৌচালা বলতে ঘরকে বুঝাচ্ছে। একইভাবে, দশানন= দশ মাথা আছে যার (রাবণকে বুঝায়), সেতার= তিন তার আছে যার (বাদ্যযন্ত্রকে বুঝায়) এগুলো বহুব্রীহি সমাসের উদাহরণ।
  • এবার আসি তৎপুরুষ সমাস যেভাবে চেনা যায়। বিভক্তি লোপ পেয়ে যদি পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায় তাহলে তা তৎপুরুষ সমাস। যেমনঃ বিপদাপন্ন= বিপদকে আপন্ন। এখানে ‘কে’ বিভক্তি লোপ পেয়ে পরপদের অর্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এটি অন্যভাবেও মনে রাখা যায়।  বিশেষ্য+ক্রিয়া/ক্রিয়ার ভাব/অনুসর্গ থাকলেই তা তৎপুরুষ সমাস। অর্থাৎ শেষে ক্রিয়া থাকলেই তা তৎপুরুষ সমাস। বিভক্তি দিয়ে তৎপুরুষ সমাস নির্ণয় করতে হয়।
error: Content is protected !!