চরম হীনমন্যতাকে জয় করে পররাষ্ট্র ক্যাডার হলেন ঢাবির তরী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী তাসনিমা ইফফাত তরী। পড়াশুনায় বরাবরই ছিলেন মনযোগী আর প্রচন্ড পরিশ্রমী। স্বপ্ন দেখতেন বিসিএস দিয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডার হবেন। সেজন্য করেছেন কঠোর পরিশ্রম। বিসর্জন দিয়েছেন অনেক শখ এবং আনন্দের মুহুর্ত আর আঁকড়ে ধরেছেন নিজের স্বপ্নকে। একাগ্রচিত্তে শুধুমাত্র বিসিএস এর প্রস্তুতি নিতে গিয়ে একসময় ভুগেছেন প্রচন্ড হীনমন্যতায়। এতো কঠিন সময় পার করে অবশেষে ৩৮ তম বিসিএস এ পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১১তম স্থানটি নিজের করে নিয়েছেন।

চলুন তরীর নিজের বয়ানেই জেনে নেই কিভাবে তিনি কঠিন সময় পার করে সফলতার শিখরে আরোহণ করেছেন—

তরী বলেন, “আমি সফল কেউ নই। অন্তত এখনো নই। তাই সফলতার গাঁথা আমাকে মানায় না। কিন্তু একটু নিজের মনটা হালকা করি? গত ৩ বছর আমি ফেইসবুকে ছিলাম না। কারণ হীনমন্যতা। আমার চারপাশে সবাই কোথাও না কোথাও জয়েন করেছে আমি বসে আছি।

সারাদিন ডিপ্রেসড, ফ্রাস্ট্রেটেড থেকে কাটিয়েছি। সকালে উঠে পড়তে বসতাম। সেই পড়ার টেবিলে চোখের জল টপটপ করে পড়তো। বিসিএস ছাড়া কোথাও এপ্লাই করিনি। এই বিসিএসটা না হলে কী হবে আমার? আমার ৩ টা বছর যে হারিয়ে যাচ্ছে! এমন একটা রাত নেই যে কাঁদিনি বিশ্বাস করেন। আল্লাহ কে বলতাম “আল্লাহ আমার কপালে এতো কষ্ট কেন? আল্লাহ আমার একটা গতি করো”। আবার দিনের বেলা দরজা জানালা বন্ধ করে পড়তাম।

শেষদিকে ফ্রাস্ট্রেশনের চরম সীমায় পৌঁছে যাই। কারো সাথে কথা বলতাম না। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। খালি পড়তাম আর কিছু মনে নেই। মা আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁদতো। রেজাল্ট দেয়ার দিন ভাবলাম ফেল করবো কোথায় পালাই? তারপর রেজাল্ট দিলো আমি তখন কুরআন শরীফ পড়ছিলাম। বাকীটা সবাই জানেন। আলহামদুলিল্লাহ।

আমাকে এক আত্মীয় বলেছিলেন “না না ওর ফরেন হবে না। ওর দ্বারা সম্ভব না” আরো কত কী! কত মানুষের খোঁটা শুনেছি! কত কাছের মানুষের চেহারা পাল্টাতে দেখেছি! মা বলতো “তরী মুখে জবাব দিবা না, কর্মে জবাব দিবা। ইনশাল্লাহ তোমার দিন আসবে।” এই কথাগুলো শেয়ার করলাম কারণ শুধু এটুক বলার জন্য যে আল্লাহ তার বান্দাদের অনেক কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা নেন। ধৈর্য খুব খুব সুন্দর একটা জিনিস। আরেকটি কথা। আমার বাবা মায়ের কোনো ছেলে নেই দেখে অনেকেই অনেক কথা বলেছে। আমার মা কাল শুনিয়ে দিয়েছে তাদেরকে “মেয়েদের কম ভাববেন না। মেয়েরাও মা বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।”

এবার কিছু কাজের কথা বলি; কীভাবে পড়েছি।

১) পুরাতন বছরের প্রশ্নগুলো প্রচুর এনালাইজ করতাম।

২) রিটেনের সময় খুব নোট করে গুছিয়ে পড়তাম। এতে খুব সুবিধা হতো রিভাইজ করতে।

৩) ড্যাটা, টেবিল, ডায়াগ্রামের জন্য আলাদা খাতা ছিলো। সোর্স সহ নোট করে ফেলতাম। এজন্য নেটসার্ফিং করতাম বেশি বেশি

৪) রিটেনের সময় হাত চালু রাখার জন্য প্রচুর লিখতাম ক্লকিং করে। সাড়ে ৩ মিনিটে এক পাতা এভাবে।

৫) গ্লোব কিনেছিলাম। চোখ বুলাতাম সবসময়।

আন্তর্জাতিক এবং ভাইভার জন্য খুব খুব উপকারী শেষ কথা, কারো স্ট্র্যেটেজির সাথে কারো টা মিলে না। আপনার টা আপনি বানাবেন কিন্তু পড়েন বেশি বেশি। পরিশ্রমের বিকল্প নেই।”

তাসনিমা ইফফাত (তরী) পররাষ্ট্র ক্যাডার( ৩৮ বিসিএস এ সুপারিশপ্রাপ্ত)

মেধাক্রমঃ ১১ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি

error: Content is protected !!