দারিদ্র্যের বেড়াজাল ভেঙ্গে একজন শিল্পী মোদকের প্রশাসন ক্যাডার হওয়ার গল্প

জীবনে সফলতা পেতে গেলে সঠিক পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের যে কোনো বিকল্প নেই তা আরেকবার প্রমাণ করলেন হবিগঞ্জের মেয়ে শিল্পী মোদক।পারিবারিক আর্থিক অনটন দমিয়ে রাখতে পারেনি তার শিক্ষাজীবনের সফলতাকে।আজ জানবো শিল্পী মোদকের লড়াকু জীবনের সফলতার গল্প।

স্কুলের পরীক্ষায় সবসময় প্রথম হয়েছেন শিল্পী। ভালো ফলাফলের জন্য শিল্পীকে স্কুলে বেতন দিতে হতো না; এমনকি শিক্ষকরাই তাকে বই দিতেন। স্কুলে সবসময় বিতর্ক প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা ও গানে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ক্লাস এইট পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়া শিল্পী মোদক এর মা-ই ছিলেন একমাত্র শিক্ষক। ক্লাস এইটে হবিগঞ্জের রামকৃষ্ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হিসেবে তিনি জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। সে সময়কার প্রধান শিক্ষক শিল্পীর নাম লিখে রাখেন স্কুলের দেয়ালে। সেই প্রধান শিক্ষক আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তার প্রিয় ছাত্রী শিল্পীর নাম আজও স্কুলের দেয়ালে রয়ে গেছে। সেই মেধাবী শিল্পীই ৩৭তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

২০০৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় দারিদ্র্যকে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে শেখেন শিল্পী। তখন থেকেই তার করানো টিউশনি শুরু হয়। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তির পর প্রতিদিন মেহেন্দীবাগ এলাকার বাসা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে কলেজে আসতেন। তবে কলেজের শিক্ষকরা বেশ আন্তরিক ছিলেন।বিনাবেতনে প্রাইভেটও পড়িয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।

২০০৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হন শিল্পী।তবে যেহেতু বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন, তাই বাংলা ছেড়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব ও বীজবিজ্ঞান বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রতিদিনই বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করে নিজের খরচ জোগাড় করতেন এই পরিশ্রমী অদম্য মেধাবী। অনার্স এবং মাস্টার্স, দুটোতেই সিজিপিএ ৩.৯০ পেয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। আর এই অসাধারণ ফলাফলের জন্য অর্জন করেন রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক। ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন, কিন্তু সার্কুলার না হওয়াতে শুরু করেন বিসিএসের প্রস্তুতি। মাঝে শাহজালাল সিটি কলেজে এক বছর শিক্ষকতাও করেছেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।

৩৭তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার একমাস আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে দিনরাত পড়াশোনা শুরু করেন। সারাক্ষণ বইয়ের পাতায় এতটাই নিমগ্ন থাকতেন যে তার মা-ই তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন। বিসিএসে ধাপে ধাপে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর অবশেষে ফলাফলে তিনি সুপারিশপ্রাপ্ত হলেন প্রশাসন ক্যাডারে। শিল্পীর ইচ্ছা তার মতো মেয়েদেরকে সাহায্য করা, যারা দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি দেশসেবা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেন শিল্পী মোদক। দেশের একজন প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে সেই সুযোগ পাবেন বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন তিনি।

নামঃ শিল্পী মোদক
প্রশাসন ক্যাডার, ৩৭তম বিসিএস

error: Content is protected !!