কেয়া গ্রুপ খালেক পাঠান

ইটভাটার শ্রমিক থেকে হাজার কোটি টাকার কেয়া গ্রুপ এর মালিক হলেন খালেক পাঠান !

ভিশন এবং মিশন থাকলে যে কেউ সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে যার বাস্তব উদাহরণ আব্দুল খালেক পাঠান। বাল্যকাল থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার ভিশন ছিল তার। এখন তিনি কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান। দেশের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।

আব্দুল খালেক পাঠান গাজীপুরের কোনাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এই কোনাবাড়ি থেকেই উদ্যম, নিষ্ঠা, মেধা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসাকে নিয়ে গেছেন ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশে। বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কেয়া গ্রুপ। বছরে এর প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ডজনের বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে বার্ষিক টার্নওভার ও প্রতিষ্ঠানের জনবলের সংখ্যা। কেয়া গ্রুপের দাবি, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এখানে কয়েক হাজার কর্মচারি ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব জমা দিচ্ছে শত কোটি টাকা। প্রসাধনী, পোশাক ও এগ্রো খাতে দেশের শীর্ষে রয়েছে গ্রুপটি। পাশাপাশি গ্রুপটির কেয়া কসমেটিক্স এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান।

কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার মুন্সী গোলাম মোস্তফা সহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেয়া কসমেটিক্স সবসময় পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট থাকে। কসমেটিকস সামগ্রী উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ কাঁচামাল। বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন করায় কেয়ার পণ্য দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে। ভারত, ভুটান, নেপাল, সৌদি আরব, কাতার, দুবাই সহ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে কেয়ার কসমেটিক্স সামগ্রী রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে কেয়া কসমেটিক্স সামগ্রী যাচ্ছে।এসব দেশের প্রতিনিধিরা কেয়ার কারখানা পরিদর্শন করে অবকাঠামো সর্বাধুনিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

এছাড়া নতুন বাজারে প্রবেশ করছে কেয়ার কসমেটিকস সামগ্রী। জানা গেছে, কোম্পানীর চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠান ইট ভাটায় চাকরি নিয়ে জীবন সংগ্রাম শুরু করেন। পরে তিনি নিজেই একটি ইটভাটা স্থাপন করে মালিক হয়ে যান। এসময় ব্যাপক পরশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। অনেকেই জানান, স্কুল ছুটির পর বন্ধুরা যখন খেলাধুলায় মগ্ন থাকতো তখন তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন। মজার বিষয় হলো, এসময় অর্থ বৃদ্ধির জন্য কম দামের বাজার থেকে হাস-মুরগি ও ছাগল কিনে বেশি দামের বাজারে তা বিক্রি করতেন। এভাবেই তার ব্যবসায়িক জীবনের মোড় পরিবর্তন হতে থাকে। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। শুধুই অর্জন করেছেন একের পর এক সাফল্য।

তার গড়া অন্যতম ইন্ডাস্ট্রি হলো, কেয়া নীট কম্পালজিট লিমিটেড, কেয়া স্পিনিং মিল লিমিটেড, কেয়া কটন মিলস লিমিটেড, কেয়া ইয়ার্ন্স মিল লিমিটেড, কেয়া ইউরোপ ও কেয়া ইউএসএ, কেয়া কসমেটিক্স লিমিটেড, কেয়া এগ্রো প্রসেস, কেয়া পলি এডভ্যাটাইজিং ও কেয়া ডেভেলপারস লিমিটেড। এর মধ্যে কেয়া কসমেটিক্স লিমিটেড দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২০০১ সালে তালিকাভুক্ত হয়।

খালেক পাঠানের উদ্যম, নিষ্ঠা, মেধা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তোলা এসব শিল্প গ্রুপ দেশে-বিদেশে পেয়েছে প্রচুর খ্যাতি। কটিন বাস্তবতার মাঝেও খালেক পাঠানের জীবন এখন আলোকিত। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে একটু একটু করে উন্নয়নের শীর্ষে চলে আসেন। স্পষ্টভাষী, সৎ এবং উদার মনোভাবাপন্ন এই ব্যক্তি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে থেমে থাকেননি। বরং স্বয়ংসম্পূর্ণ এই উদ্যোক্তা দেশীয় বাজারে শীর্ষস্থান দখল করেও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রায় সব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। প্রসাধনী খাত থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে যাচ্ছে। এই অর্থ যাওয়া বন্ধ করতে খালেক পাঠান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশের কসমেটিক্স খাত উন্নয়ন করতে হবে। এই উপলব্ধি থেকে কেয়া কসমেটিক্স প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত। খুব অল্প সময়ে কেয়া কসমেটিক্স দেশের মানুষের পছন্দের তালিকায় চলে আসে। খালেক পাঠান বেশ কয়েকবার পুরষ্কার পেয়েছেন যার মধ্যে প্রসাধনী ও শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

বাল্যজীবন

আব্দুল খালেক পাঠান ১৯৫৯ সালের ১৪ই মে গাজীপুরের কোনাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আব্দুল পাঠান ও মাতা বেগম আলেক জান। খালেক পড়াশুনা শুরু করেন হাতিমারা হাই স্কুলে। ১৯৭৯ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন।

প্রথম ব্যবসায় প্রবেশ

১৯৮৩ সালে গাজীপুরের কোনাবাড়িতে খালেক গ্রুপ এন্ড কোং নামে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা শুরু করেন ইটভাটা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ইটের কোয়ালিটি ভালো হওয়ায় বাজারে খ্যাতি অর্জন করেন। ে ব্যবসায় সাফল্যের কারণে তিনি বন্ধু ইট নামে আরেকটি ইটের ব্যবসা শুরু করেন। পরে তিনি ব্যবসাকে আরো সম্প্রসারণ করেন।

প্রতিবন্ধিদের পুনর্বাস

বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেখানে বাছাই করে পরিপূর্ণ শারিরীক দক্ষ কর্মচারী নিয়োগ দেয়, ঠিক তখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিচ্ছে কেয়া গ্রুপ। এ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন হাজারখানেক প্রতিবন্ধি কর্মী। উৎপাদন সহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করেছেন তারা। সামনের দিনগূলোতে কর্মকর্তা ও কর্মচারি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সব গার্মেন্টস মালিকদের দেয়া এক চিঠিতে প্রতিবন্ধিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়ার জন্য সবিনয় অনুরোধ জানান।ঐ চিঠিতে কেয়া গ্রুপকে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখানো হয়।

গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার বলেন, শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোর টার্নওভার উত্তরোত্তর বাড়ছে।মুনাফা বেড়েছে কয়েকগুণ। কোম্পানীর পণ্যের গুনগত মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।  

error: Content is protected !!